শনিবার, ০৬ Jun ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন

নেতৃত্বহীন তিন মাস: ফাইল জটে স্থবির দুদক, নিয়োগের খোঁজে সার্চ কমিটি

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ॥
চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারসহ পুরো কমিশনের পদ দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে শূন্য। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের একমাত্র সংবিধিবদ্ধ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ, মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন ও চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের মতো সব ধরনের মূল কার্যক্রম এখন পুরোপুরি বন্ধ। ফলে সংস্থাটিতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বিশাল ফাইল জট।

কমিশন ছাড়া অচল স্ক্রিনিং কমিটি
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয় ডজন (৬০-৭২টি) দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে। দুদকে অভিযোগ যাচাই-বাছাই (স্ক্রিনিং) কমিটি সচল থাকলেও কমিশন না থাকায় কোনো অভিযোগই অনুসন্ধানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না। কারণ, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী নতুন কোনো অভিযোগ আমলযোগ্য করতে কমিশনের সরাসরি অনুমোদন বাধ্যতামূলক।

একইভাবে আদালতে নতুন মামলা করা, অভিযোগপত্র জমা দেওয়া, সন্দেহভাজনদের সম্পত্তি ক্রোক, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা আসামি গ্রেপ্তারের মতো জরুরি আইনি প্রক্রিয়াগুলোও থমকে আছে।

বিকল্প ক্ষমতা পায়নি সচিবালয়
দুদক আইনের শক্তিশালী কাঠামোর কারণে কমিশনের অনুপস্থিতিতে এই স্থবিরতা কাটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দুদক সচিবের প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে দুদক থেকে সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও তাতে সায় দেয়নি সরকার।

সার্চ কমিটি গঠনের তোড়জোড়
আইন অনুযায়ী, কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করতে পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই (সার্চ) কমিটি গঠন করতে হয়। সরকার ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে- যার উদ্দেশ্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে সভাপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতিকে সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া। এই দুই বিচারপতির নাম পাওয়া গেলেই ৫ সদস্যের সার্চ কমিটি চূড়ান্ত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুদক আইনে কমিশনের পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে তা পুনর্গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে বিকল্প কী করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে কমিশন পুনর্গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তই এখন চূড়ান্ত।

নিয়োগের আইনি প্রক্রিয়া
দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী সার্চ কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে তিনজন কমিশনার পদের বিপরীতে ছয়জনের একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবে। রাষ্ট্রপতি সেই তালিকা থেকে তিনজনকে নিয়োগ দেবেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করবেন। এই কমিশনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।

যেভাবে তৈরি হলো সংকট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, ২৯ অক্টোবর তৎকালীন মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করে। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১০ ডিসেম্বর সাবেক সচিব ড. আবদুল মোমেনকে চেয়ারম্যান এবং সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ৫ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও এক বছর দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৩ মার্চ এই কমিশন পদত্যাগ করে। এরপর থেকেই শীর্ষ নেতৃত্বহীনতায় ভোগছে দুদক।

ফাইল জট ও কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
বর্তমানে কর্মকর্তারা কেবল আগের অনুমোদিত অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত ফাইলগুলো প্রস্তুত করে পরিচালক বা মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যন্ত পাঠাতে পারছেন। কিন্তু ডিজি পর্যায় থেকে ফাইলগুলো কমিশনে উপস্থাপনের সুযোগ না থাকায় শত শত ফাইল জমে পাহাড় হয়েছে। নতুন কমিশন না আসলে এই জট খোলার কোনো সুযোগ নেই।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, “কমিশন না থাকায় নতুন অনুসন্ধান, মামলা বা চার্জশিট অনুমোদনের সুযোগ নেই। আমরা নতুন কমিশনের অপেক্ষায় আছি। আশা করছি দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরবে।”

একই শঙ্কা প্রকাশ করে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, “দুদকের সার্বিক কার্যক্রম পুরোপুরি কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কমিশন না থাকায় স্থবিরতা তো তৈরি হয়েছেই, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হলে সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে।”

অধ্যাদেশ রহিত ও পুরোনো আইনের কার্যকারিতা
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তবে পরবর্তীতে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। ফলে আগের মূল ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ বহাল থাকায়, সেই আইন মেনেই নতুন তিন সদস্যের কমিশন নিয়োগ দিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com